,
সংবাদ শিরোনাম :

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিষিদ্ধ! শিশুদের ফিরিয়ে আনতে হবে পড়ালেখায়।

একেএম ফখরুল আলম বাপ্পী চৌধুরী : শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কর্ণদ্বার। আমি বলবো না সব শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ না। নিবিড় পরিচর্যা, সঠিক যত্ন, অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা সহ ৬টি মৌলিক অধিকারের বেষ্টনী দিয়ে গড়ে তুলা শিশুটিই আগামী দিনের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হতে পারে। এর ব্যত্যয় যদি হয় তবে বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে তাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রে যতগুলি অপরাধ জনিত ঘটনা ঘটছে তার ৩০% অপরাধের সাথে কৌশলে শিশুদের ব্যবহারিত করা হচ্ছে। শিশুরা কাঁদামাটির মতো, কুমারের হাতের ছোঁয়াই কাঁদামাটি মুহুর্তেই হাতি ঘোড়াসহ অনেক আকৃতি ধারণ করে। শিশুরা ঠিক তেমনি। জন্মের পর একটি শিশু যার হাতে লালন পালন হবে তার নৈতিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই সে বড় হবে। দেরিতে হলেও প্রতিটি শিশুকেই ১৪ বছর পর্যন্ত রাষ্ট্রের দায়িত্বে নিতে হবে।
শিশুশ্রমিক বা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমিক নিরসন প্রকল্পে কত বছর থেকে কত বছর পর্যন্ত অন্তর্ভূক্ত হবে এই নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে। যখন একটি শিশুর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্যে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একজন ব্যক্তিও থাকেনা তখন সেই শিশুটিও হামাগুড়ি দিয়ে খাবার সন্ধান করে হাত পেতে পেতে। যখন শিশুটি ৫ বছর হয় তখন কোন রেলওয়ে প্লাটফর্মে, ফেরি ঘাটে তার চাইতেও ওজনের বোঝা তুলে দেই তার মাথায়। সেই শিশু শ্রমিকের কথা আমি বলছি, যে তার দেহের চেয়ে বেশি ওজনের বুঝা বয়ে নিয়ে যায়, ব্রাশ করে জুতো, চালায় হাঁপর, আর বর্ণমালাগুলো শেখার আগেই যে শেখে ফিল্মের বিকৃত রুচির গান, বিড়ি খাওয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি নেশার সাথে পরিচিত হয়ে যায়- ভালো মন্দ বুঝার আগেই। সেই শিশুটি আর শিশু থেকে না, শিশু অপরাধী হয়ে যায়, হয়ে যায় শ্রমিক।
এখন প্রশ্ন থাকে তার বয়স তো মাত্র ৫-৭ বছর। নিয়ম যদি হয় ১০ বছর থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত শিশুরাই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমিক তাহলে পাঁচ সাত বছরে জীবনের ঝুকি নিয়ে যে শিশুটি কাজ করে বেড়াচ্ছে তাদেরকে আমরা কি নাম দিব?
এখানে মূলবিষয় হচ্ছে শিশু। প্রথমেই বাহির করতে হবে শিশু কাকে বলে। শিশুর সংজ্ঞা কি। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়স সকল বাংলাদেশী ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। আইনের ভাষায় আমাদের দেশে কারা শিশু। আর শিশুশ্রম বিষয়টি কী? সাধারণত পৃথিবী জুড়ে ১৮ বছর কম বয়সী সবাইকে শিশুর সংজ্ঞায় ফেলা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও কাগজপত্রে বিষয়টি মানা হলেও বাস্তব চিত্র অবশ্য ভিন্ন। মূলত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে শিশুদের তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। শৈশবকাল বলা হয়েছে ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বয়সকে। যাদের বয়স ৬ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত তাদের বিবেচনা করা হয় বাল্যকাল হিসেবে। আর ১১ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময়কে বলা হয় কৈশোরকাল। অবাক করা তথ্য হলো এই তিন শ্রেণী বিবেচনা করলে আমাদের দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার অর্ধেক শিশু।
বাবার কাঁধে মায়ের কোলে হেঁসে খেলে বড় হয়ে উঠা, বাবা-মার আঙ্গুল ধরে স্কুলে যাওয়া প্রতিটি শিশু জন্মগত অধিকার। কেন একটি শিশু শ্রমিক হয়? প্রতিটি শ্রমিক শিশুর পিছনে এক একটি হৃদয়বিদারক গল্প থাকে। বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন ২য়, ৩য়, ৪র্থ পর্যায় প্রকল্পে স্বশরিলে ঝুকিপূর্ণ শিশু শ্রমিকের জরিপ করতে গিয়ে যে ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে শিশুশ্রমিকের নিবর ক্রন্দন বার বার ব্যাকুল করে তুলে মনে হয় যদি সামর্থ্য থাকতো তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুশ্রমিকের দায়িত্ব নিয়ে, নিজেকে অলংকৃত করতাম।
গৃহ পরিচালনার কাজ নিঃসন্দেহে একটি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম। পত্রিকা টিভি খুললেই ভেসে উঠে গৃহকর্তা ধারা কি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক শিশু মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। কিন্তু আমরা গৃ পরিচালনার কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বলছি না, শুধু ৩৮টি ট্রেডকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম দাবি করছি। একটি শিশু একা রাস্তায় বের হওয়ায়ইতো ঝুঁকিপূর্ণ। তাহলে শিশুশ্রম ও ঝঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম আলাদা করা কতটুকু যুক্তিযত। প্রতিটি শিশু শ্রমই ঝুঁকিপূর্ণ। এক ঢাকা শহরে পাঁচ থেকে সাত বছরের ছেলে মেয়ে ফুল পানি নিয়ে চলন্তগাড়ির পাশ দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা বিক্রি করে থাকে। তাদেরকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বলতে পারি না কেন? ৩৮টি ট্রেডে ঝুঁকিপূর্ণকে আবদ্ধ করা কতটুকু যুক্তিযত।
১৯৯৯ সালের জুন মাসে আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও শিশুশ্রম নিরসন সনদ-১৮২ গ্রহণের পর থেকেই প্রতি বছর ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশে বর্তমান ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু শ্রমিক রয়েছে যাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের পরিচালনার ১ম পর্যায় থেকে ৭ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত বয়স সীমায় নির্ধারণ করা হয়েছিলো। ৪র্থ পর্যায় এসে অদৃশ্য কারণে ১০ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত করা হয়। যার পক্ষে এখনো কোন যুক্তি দাড় করাতে সক্ষম হয়নি কর্তৃপক্ষ। তাহলে ১ম পর্যায়, ২য় পর্যায়, ৩য় পর্যায়ের যে নীতিমালা ছিলো তা কি সংশোধন করা হয়েছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল ক্যান্টিন ও দোকানগুলোতে খাবার পরিবেশন করা হয় শিশুদের দ্বারা। যেখানে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোর হল ক্যান্টিনে শিশু শ্রমের মিলন মেলা, সেখানে দেশের বিভিন্ন কলকারখানা, মিল ফ্যাক্টরিতে শিশু শ্রম কেমন করে বন্ধ হবে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিশ্বে শিশুশ্রমে আনুমানিক ১৫ কোটি ২০ লাখ শিশু রয়েছে, যার মধ্যে ৭ কোটি ২০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।
করোনাকালীন অন্যান্য দেশের চাইতে বাংলাদেশে শিশুশ্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনাকালীন মহামারির সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ও কলকারখানা চালু থাকায় শিশুশ্রম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় দুই বছর বন্ধ আছে। সরকারী প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের সন্তানেরা বেশি লেখাপড়া করে। সরকারের বিনা বেতনে অধ্যয়ন ও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো শ্রমজীবী পরিবারের শিক্ষার্থীরা। শ্রমজীবী পরিবার তাই তাদের সন্তানদের শিশু শ্রমে না পাঠিয়ে স্কুলগামী করেছিল। অথচ, কোভিড-১৯ মহামারির ছোবলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুদের বিভিন্ন কারখানা, হোটেল, ওয়েল্ডিং কারখানা, সড়ক ও পরিবহণ, যন্ত্রাংশ নির্মাণ কারখানা, তামাক কারখানা, ব্যাটারিচালিত ভ্যান-রিক্সা চালানোতে নিয়োজিত করছে। যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি এবং শিশু শ্রমের চাহিদা প্রচুর তাই অভিভাবক ও কারখানার মালিকেরা শিশু শ্রমে শিশুদের বাধ্য করছে। অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রম চলমান থাকলেও শ্রমজীবী পরিবারের শিশুরা সেই কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে আছে। কার্যত ২০২০ সাল থেকেই তারা লেখাপড়া ও একাডেমিক সকল কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়েছে। সমাজের এই অংশের শিশুরা এখন উদ্বেগজনকহারে শিশুশ্রমে। পরিবারের কিছুটা আর্থিক সচ্ছলতা ও নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে শিশুশ্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবহিকতা শিশুশ্রম নিরসনে ব্যাপকহারে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন না করে তাহলে রাষ্ট্রের সমস্ত উন্নয়ন-অর্জন শিশুশ্রমিকের ঘাঁমের সাথে ভেসে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

যোগাযোগঃ

মীর প্লাজা ( ৩য় তলা ), ৮৮  সি কে, ঘোষ রোড , ময়মনসিংহ ।

মোবাইল: ০১৭১১-৬৮৪১০৪

ই-মেইল: matiomanuss@gmail.com