,
সংবাদ শিরোনাম :
«» ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বাসচাপায় ৭ জন নিহত «» `ভারতের সাথে রক্তের সম্পর্ক, চীনের সাথে অর্থনৈতিক’- মেহেরপুরের মুজিবনগরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী «» বরগুনায় সিফাতের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ, আহত ৩ «» গাইবান্ধায় পুকুরে ও নদীতে ডুবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে «» করোনাকে হারাতে সক্ষম ভ্যাকসিন তিন দিনের মধ্যেই আসছে বাজারে রাশিয়ার দাবি! «» ‘সিনহার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ সরকার হটানোর দিবাস্বপ্ন দেখছে’ «» পাকিস্তানের নতুন মানচিত্র নিয়ে ইমরানের সাবেক স্ত্রীর কটাক্ষ: ‘আমার তো দিল্লিও চাই’ «» সিনহার মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা, দুই বাহিনীর সম্পর্কে চিড় না ধরার আশ্বাস: যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই বাহিনীর প্রধান «» স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে হাসপাতালগুলোতে অভিযান পরিচালনার অনুরোধ «» টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে মামা বাড়ি বেড়াতে এসে ভাই-বোনের মৃত্যু

একান্ত সাক্ষাৎকারে বরেণ্য বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক যতীন সরকার

মাটি ও মানুষ: ‘আমি বিশ্বাস করি-যে মানুষই পারবে তা দূর করতে-
যত রকমের বিপর্যয় পৃথিবীতে আগে ঘটেছে সব রকমের সমাধান মানুষই করেছে। এখন যে অবস্থা দেখা দিয়েছে সেইটাও মানুষই দূর করবে এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই বলে আমি মনে করি’

 

একান্ত সাক্ষাৎকারে বরেণ্য বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক যতীন সরকার
করোনাকালীন সময়ে কেমন আছেন এবং ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন, আলপনা বেগম-
দীর্ঘদিন ধরেই আমি অসুস্থ। আত্রাইটিসে ভুগছি। ঘার থেকে পা পর্যন্ত সবটাই আক্রান্ত। এর মাঝেও কিছু কিছু কাজ করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু গত এক বছর যাবৎ আমি একেবারে গৃহবন্দী হয়ে পড়েছি। শুধু করোনার জন্যে নয়। এমনিতেই আমরা শরীর এতো খারাপ হয়েছে যে আমি এখন কিছুই করতে পারিনা। আমার মাথার মধ্যেও কিছু ধরে না। লেখাপড়াও করতে পারিনা। এই হচ্ছে অবস্থা।
তবুও দেশে যা ঘটে বা পৃথিবীতে যা ঘটে সেটাতো আমার মাথার মধ্যে কোন না কোন ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। এই যে করোনা নামক একটা বিপর্যয়, এটাকে বিশ্ব বিপর্যয় বলতে পারি। এইটা যে সমগ্র বিশ্ব জুরে আসছে, এমন ঘটনা পৃথিবীতে এর আগে কোথাও ঘটেছে কিনা আমার অন্তত জানা নেই।

 

আগে হয়তো একটা দেশে বা একটা অঞ্চলে কিছু বিপর্যয় ঘটেছে, তারপরে পৃথিবীর সমস্থ মানুষ মিলে সেটাকে সমাধানও করেছে।
কিন্তু এই সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে যে বিপর্যয় ঘটে গেছে এইটা কে রক্ষা করবে ?

 

আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দিকবেদিক দৌড়াদৌড়ি করেছি। চেষ্টা করেছি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে কিভাবে নিজেদের রক্ষা করা যায় ? কিভাবে তাদেরকে প্রতিরোধ করা যায়? এক পর্যায়ে আমরা একত্র হয়েছি। চিন্তা করেছি, কথা বলেছি। আর এখন মানুষকে মানুষ থেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এবং বিচ্ছিন্নতাই এখন সমাধান বলে বলা হচ্ছে। যে ঘরের মধ্যে বসে থাকবে।

 

আর এই ঘরের মধ্যে বসে থাকা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ না থাকা, এইটা যে কত বড় একটা বিপর্যয় সেটা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু কথা হচ্ছে যে, মানুষ তো শুধু ঘরে বসে থেকে পারে না, যারা দিন আনে দিন খায়, এমন মানুষদের অবস্থাগুলো কি অবস্থায় দাঁড়িয়েছে সে কথাও তো অতি সহজে বুঝা যায়। কাজেই এই অবস্থাতে কোনটা যে করা হবে এইটাই মানুষ বুঝে উঠতে পারছেনা।
আমি তো ঘরের মধ্যেই বন্দী এবং আমার ঘরের ভেতরে কেউ আসেনা, মেইন বাড়ির সামনে তালা লাগানো আছে। কারো সংগে যোগাযোগ নেই এবং এই যে এই অবস্থা আমাকে আরো মানসিকভাবেই বিপযস্থ করে ফেলছে। তবুও এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে, সে বিষয়েও আমি কিন্তু নিঃসন্দেহ। আমি বিশ্বাস করি-যে মানুষই পারবে তা দূর করতে-
যত রকমের বিপর্যয় পৃথিবীতে আগে ঘটেছে সব রকমের সমাধান মানুষই করেছে। এখন যে অবস্থা দেখা দিয়েছে সেইটাও মানুষই দূর করবে এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই বলে আমি মনে করি।

 

আগে একটা বিপর্যয় যে কোন একটা দেশে হতো, এখন সারা পৃথিবীর মানুষের মাঝে একসাথে এই রোগ দেখা দিয়েছে। কাজেই পৃথিবীর সমস্থ মানুষকেই যে ভাবেই হোক মিলাতে হবে এবং বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আর সেটির সম্ভাবনা যে একেবারে নাই এমন কথা কিন্তু বলা যায় না। সম্ভবনা এখনই দেখা দিয়েছে।

 

ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর প্রতিষেধক আবিস্কারের জন্য চেষ্টা হচ্ছে। কতদিন লাগবে সেটা জানিনা। কিন্তু মানুষ এই প্রতিষেধক আবিস্কার করবেই। কারণ আমি বিশ্বাস করি যে, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। রবীন্দ্রনাথ এই যে কথাটা বলেছিলেন সেই বিশ্বাস আমাদের সমব সময় রক্ষা করতে হবে।

 

মানুষ পৃথীবির সব বিপর্যয় আগে দূর করেছে , এখনো দূর করবে। এখন মানুষে মানুষে বিছিন্ন, এক সাথে কেউ মিলিত হতে পারবে না। আইসোলেশন তৈরী করা হয়েছে। তারমধ্যেও আমরা দেখেছি চীনকে যেখানে করোনার মহামারি প্রথম শুরু হয়েছিলো। সেই চীনই এখন বিভিন্ন দেশে এমনকি আমাদের বাংলাদেশেও প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে। সমাধানের অভিজ্ঞতা যেটি সেটি সবার সাথে বিনিময় করার জন্য।

 

এইভাবে পৃথিবীর সমস্থ মানুষ আবার মিলবে। মিলেই তারা কোন না কোনভাবে এই বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করবে।
এখন পৃথিবীর সমস্থ মানুষকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে গিয়ে মানুষের মাঝে যে নতুন সম্মিলন ঘটবে তাতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সৃষ্টি হবে বলেও আমি মনে করি। আমি বিশ্বাস করি বারবার রবীন্দ্রনাথের এই কথাটি বলি মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সেই বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করে যাবো।

 

পত্র পত্রিকা এখন আর আসেনা। নেত্রকোনায় নাকি একেবারে আসেই না। যে কারেন আমার হকার পত্রিকা নিয়ে আসেনা। এইটাতে আরো বিপযস্ত মানুষ। পৃথিবীর খবরটা যথাযথ ভাবে পেতে হলে টেলিভিশনের পাশাপাশি পত্র পত্রিকাও পড়তে হয়।
টিভিতে যতটুকু পাওয়া যায় সেটা বিস্তৃত নয়। বিস্তৃতভাবে পেতে পারতাম যেটিতে সেটি পাচ্ছিনা এই পত্রিকা না থাকার জন্য।
আজকে করোনা হওয়ার ফলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে করোনা রোগী যেমন ভর্তি হতে পারছেনা অন্যান্য রোগীরাও হাসপতালে জায়গা পাচ্ছে না। করোনাই শুধু নয় অন্যান্য রোগেও মানুষের এখন এমন এক অবস্থা হযেছে যে এ কথা আগে কল্পনাও করা যায় নাই। তবু আমার শেষ কথা সেইটাই মানুষের মাঝে যে বিপর্যয় এসেছে মানুষই সেটা দূর করবে।

 

শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেছেন,
স্কুল কলেজের যে অবস্থা হয়েছে অথাৎ শিক্ষা খাতে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে এটির সমাধানটা সহজে পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয় না। পড়াশোনার জন্য আবার যদি স্কুল কলেজ খুলে দেয়া হয় তাহলেও বিপর্যয়ে ছেলে মেয়েদের ফেলে দেওয়া হবে। সুতরাং এটিও করা যায় না। আবার লেখাপড়া যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই অবস্থাও মেনে নেয়া যায় না। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতার পর থেকেই নানা ধরনের বিপর্যয় দখো দিয়ে আসছে। কাজেই এই করোনা আবার নতুন বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। আমার শেষ কথা সেইটাই এই বিপর্যয়ও মানুষই দূর করবে।

 

 

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বিপর্যয় পৃথিবীতে বরাবরই এসেছে। এটিও তোমাদেরকেই দূর করতে হবে। বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করে যেতে হবে। কারণ পড়াশেনার বিকল্প কোন কিছু নেই। আমরা পড়াশোনা সঠিক নিয়মে করিনা বলেই বিভিন্ন সময়ে সমাজ ব্যাবস্থা নিয়ে বিপর্যয়ে পড়ি। সেটা থেকে পড়ে হয়তো উত্তোরণও করি। কিন্তু আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে আমাদের সমাজ ব্যাবস্থার ভাঙন কমই হবে।

 

আগামী ১৮ আগস্ট হবে যতীন সরকারের ৮৫ তম জন্মদিন। তিনি ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে (বাংলা ১৩৪৩ সনের ২ ভাদ্র) নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে জেলা শহরের সাতপাই “বানপ্রস্থ” নিজ বাড়িতে বসবাস করেন। যিনি অধ্যাপক যতীন সরকার নামেই সমধিক পরিচিত, বাংলাদেশের একজন প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ ও লেখক।
আজীবন তিনি ময়মনসিংহে থেকেছেন এবং নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন।

 

তার রচিত গ্রন্থসমূহ তার গভীর মননশীলতা ও মুক্তচিন্তার স্বাক্ষর বহন করে। ১৯৬০-এর দশক থেকে তিনি ময়মনসিংহ শহরের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি অসাধারণ বাগ্মীতার জন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার উপস্থিতি শহরের প্রতিটি সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্রোগ্রামে অনিবার্য ছিল। তিনি সাংস্কৃতিক উদিচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি ছিলেন। তিনি ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের পদক লাভ করেছেন। ২০০৭ সালে তিনি শাস্্র ও সমাজ (শমজ) নামক একটি পত্রিকা শুরু করেছিলেন, ২০০৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করা হয়।

 

 

প্রকাশনা সম্পাদনা
এ পর্যন্ত তিনি ৩৫ টি শিরোনামে বই প্রকাশ করেছেন। ২০০৫ সালে প্রকাশিত পাকিস্থানের জন্ম মৃতু-দর্শন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা বই। ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের কবিগান আরেকটি বই। তার আরো কিছু বই রয়েছে যার মধ্যে প্রথম বই ১৯৮৫ সাহিত্যের কাছে প্রতাশা, বাঙ্গালী সমাজতন্ত্র ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, মানব মন মানব ধর্ম ও সমাজ বিপ্লব, সিরাজউদ্দিন কাশিমপুরী, গল্পে গল্পে ব্যাকরণ এবং চিন্তা চর্চার দিগদিগন্ত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial