,
সংবাদ শিরোনাম :
«» ২০৩০ সালের মধ্যে সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় হবে ডিজিটাল: প্রধানমন্ত্রী «» ছোটদের সঙ্গে বড়রাও ! স্বাস্থ্যের তলায় তলায় দুর্নীতি বছরের পর বছর «» ধোবাউড়ায় জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন অবহিত করণ ও কর্মপরিকল্পনা সভা অনুষ্টিত «» কিশোর গ্যাংয়ের দুই সদস্য গ্রেপ্তার: উত্তরখানে সোহাগ হত্যা «» ধর্ষণের অভিযোগটি ভিপি নূরের বিরুদ্ধে নয় «» সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে মূল ঘটনার বিকৃতভাবে উপস্থাপন করায় প্রতিবাদ «» সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা কি ? «» ভালুকায় সাংবাদিক নিগ্রহের বিচার দাবিতে মানববন্ধন «» ইসরায়েল ইস্যুতে প্রকাশ্যে সৌদি বাদশাহ-যুবরাজের বিরোধ! «» শতকোটি টাকা, অফিসে এলাকায় সাম্রাজ্য স্বাস্থ্য-শিক্ষা ডিজির ড্রাইভারের

দারিদ্র্য বাড়ছে, বরাদ্দ বাড়ছে না

মাটি ও মানুষ: ‘চাল-লিচুতে ভরপুর, জেলার নাম দিনাজপুর’ স্লোগানটি বানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ জেলা দেশের চালের চাহিদার একটা বড় অংশ মেটায়। এর খ্যাতি আছে ‘লিচুর রাজধানী’ হিসেবে। শাকসবজিও ফলে ভালো। অথচ এটা কিন্তু দেশের দ্বিতীয় গরিব জেলা।

 

 

দিনাজপুরের গৌরব ও সাফল্যগাথার উল্টো পিঠেই আছে এই নিষ্ঠুর সত্য। ২০১০ সালে এ জেলার ৩৭ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল। শেষ হিসাবে ২০১৬ সালে এক লাফে এ হার ৬৪ শতাংশে পৌঁছায়।

 

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পাঁচ থেকে ছয় বছর পরপর খানা, অর্থাৎ এক পাকে খাওয়া সংসারের আয় ও ব্যয় নির্ধারণের জরিপ করে। এ হিসাব সেই জরিপের।

 

 

কুড়িগ্রাম দেশের ১ নম্বর গরিব জেলা। সেখানকার ৭১ শতাংশ মানুষ গরিব। দারিদ্র্য সেখানেও বেড়েছে, তবে মাত্রাছাড়া বেশি বেড়েছে জেলায় দারিদ্র্য বাড়ার খবর জানেন না বিরল উপজেলার রানীপুর গ্রামের কৃষক মোকছেদুর রহমান। তবে তিনি বললেন, তাঁর চার সদস্যের সংসারে অভাব বেড়েছে। গত দুই বছর আমনে লাভ আর বোরোতে ক্ষতি হয়েছে। সামাল দিতে রাজমিস্ত্রির কাজ ধরেছেন।

 

 

মোকছেদুর স্থানীয় হিসাবে দেড় বিঘা, অর্থাৎ ৭০ শতক জমিতে ধান চাষ করেন। এবার বোরোতে কিছুটা দাম পেয়েছেন। কিন্তু আগের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠেনি। গত ৩০ আগস্ট বাড়ির উঠানে বসে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ধান লাগাই, খ্যায়াদ্যায়া দিন চলি যাউছে, কিছু করার পারি নাই।’

 

 

বিবিএসের ২০১৬ সালের জরিপটি বলছে, দেশে সবচেয়ে গরিব ১০ জেলার ৫টিই রংপুর বিভাগে। দেশের মোট উৎপাদন আর মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কিন্তু আয়, সুযোগ-সুবিধা আর সরকারের সুনজরের বৈষম্যও বেড়েছে। সেটাই উত্তরের এ অঞ্চলে দারিদ্র্য বাড়িয়েছে।

 

 

দিনাজপুরে আয়-রোজগারের মূল ভরসা কৃষি। গত কয়েক দিনে জেলা ঘুরে অনেক মানুষের সঙ্গে কথা হলো। সবাই আবাদের খরচ বাড়া আর কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কথা বললেন। বললেন, ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে।

 

 

জেলায় অন্য কাজের সুযোগ কম। বড় শিল্পকারখানা প্রায় নেই। সরকারি বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম আসে। করোনাকালে সংকট যেমন বেড়েছে, তেমনি সব রকম বৈষম্যের বিষয়টিও প্রকট হয়েছে।

কাজের সংকট

দিনাজপুর শহরের ষষ্ঠীতলা মোড়ে রোজ সকালে কাজের খোঁজে দূরদূরান্ত থেকে জড়ো হন বহু নারী-পুরুষ। তাঁরা রাজমিস্ত্রি, টাইলসমিস্ত্রি, ঢালাইমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, দিনমজুর বা কৃষিশ্রমিক।

 

গত ২৫ আগস্ট বিরল উপজেলার ভরতপুর গ্রাম থেকে সাত কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে এসেছিলেন কৃষিশ্রমিক সোহরাব আলী। বললেন, করোনাভাইরাসের কারণে কাজ পাওয়া কঠিন। জুলাইয়ে ১৫ দিন কাজ পেয়েছেন। দৈনিক মজুরি ছিল গড়ে ৪০০ টাকা। তাঁর পরিবারে ছয়জন সদস্য।

 

আছে এনজিও থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণের কিস্তির চাপ। সোহরাব আলী বলেন, ‘আয়-রোজগার কমি গেইছে। একটা গাই গরু আছিলো, সউগ ব্যাচে দিনো।’

 

সবুজ আহমেদের বাসা থেকে ষষ্ঠীতলা মোড়টা দেখা যায়। তিনি বলছেন, প্রতিদিন সকালজুড়ে ভ্যানে, সাইকেলে ষষ্ঠীতলার মোড়ে হাজারের বেশি শ্রমিক আসেন। ইদানীং তাঁদের অর্ধেকই কাজ না পেয়ে ফিরে যান।

 

আবদুল জলিল জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি। বললেন, এখানে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কাজ কম। আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের হিসাবে জেলার পাঁচ শতাধিক স্বয়ংক্রিয় চালকলে ১৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ২৭২টি ইটভাটায় মৌসুমি কাজ জোটে ৯-১০ হাজার শ্রমিকের।

 

গত ২০ আগস্ট বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সদর উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নে একটি অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে। এটা হবে ৩০০ একর জমিতে। এখানে অন্তত ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।

 

জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ৮৭ একর খাসজমি বেজার কাছে দিয়েছেন। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে। জেলায় কুটিরশিল্প নগরী আর দুটি পাটকল আছে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল পুরো বিভাগেই এই প্রথম।

বৈষম্য ও কম বরাদ্দ

জেলা শহরের চা-দোকানদার শহীদুল ইসলাম উন্নয়নবৈষম্য বোঝেন না। তাঁর কথায়, দিনাজপুরের প্রতি সরকারের নজর কম।

 

দিনাজপুর-৩ আসনের সাংসদ ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম অবশ্য বললেন, গত ১০ বছরে জেলার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও বিদ্যুৎ গেছে। নানা উন্নয়ন হয়েছে।

 

সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জেলাওয়ারি বরাদ্দে কিন্তু বৈষম্যের ছাপ প্রকট। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ সালে জেলাটিতে গড়ে এডিপির শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ গিয়েছিল। তুলনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে গিয়েছিল যথাক্রমে ২১ ও ১১ শতাংশ।

 

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ১০ বছর আগে সরকারের পরিকল্পনা কমিশন দিনাজপুরসহ উত্তরের কয়েকটি জেলার উন্নয়নে বৈষম্যের কথা স্বীকার করেছে। কমিশন দারিদ্র্য নিরসনের জন্য কৌশলপত্র আর দিকনির্দেশনাও দিয়েছে।

 

কিন্তু আদিল বলেন, সেগুলো ধরে কাজ করা হয়নি। সরকার বিশেষ নজর না দিলে এসব এলাকায় দারিদ্র্য বাড়তেই থাকবে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুহিন ওয়াদুদ বিবিএসের দারিদ্র্য মানচিত্র ধরে দুটি সরকারি দপ্তরের তথ্য নিয়ে হিসাব কষে করোনাকালের ত্রাণেও বৈষম্যের প্রতিফলন দেখেছেন।

তুহিন বললেন, গত ২৮ মে পর্যন্ত সরকার নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলায় পরিবারপিছু যথাক্রমে ২৬১ কেজি, ১৮৬ কেজি ও ১৮৭ কেজি চাল বরাদ্দ করেছে। কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় এ বরাদ্দের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৮ কেজি, ৬ কেজি ও ৭ কেজি।

বিবিএস বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলায়। প্রথম দুটি জেলায় এ হার এখন কম-বেশি ৩ শতাংশ। তৃতীয়টিতে ৪ শতাংশ। ছয় বছরের ব্যবধানে জেলাগুলোর দারিদ্র্য অনেক কমেছে। পক্ষান্তরে কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় দারিদ্র্য বেড়েছে।

দিনাজপুরের অধিকাংশ গরিব মানুষ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বাইরে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শরিফুল ইসলাম বললেন, এযাবৎ আড়াই লাখের মতো মানুষ এসব কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। বিবিএসের হিসাবে জেলায় মোট গরিব মানুষ আছে ২০ লাখের মতো।

এদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলফিকার আলী বলছেন, দিনাজপুর দ্বিতীয় দরিদ্র জেলা কি না, তা বলার জন্য আরও গবেষণা দরকার। তবে এখানে দারিদ্র্যের হার অনেক জেলার তুলনায়ই বেশি।

বিআইডিএসের গত বছরের একটি গবেষণার বরাত দিয়ে জুলফিকার প্রথম আলোকে বলেন, দিনাজপুরে ভূমি ও অন্যান্য সম্পদের মালিকানা অসম। কাজের সুযোগ কম। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখজনক। গত কয়েক দশকে সরকার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ কম নিয়েছে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial